কাঁঠাল খাওয়ার দিন

আমাদের ছোটবেলায় বাড়িতে দুটো কাঁঠাল গাছ ছিলো; ঠাকুমা বলতেন দাদুর আমলে লাগানো, কলমের গাছ I কাঁঠাল হত যেন মিষ্টি গুড় I কাঁঠাল পাকার অনেক আগে থেকেই চলত প্রস্তুতি I কাঁঠালের গুটি আসতো ঝাঁকে ঝাঁকে I অর্ধেকের বেশি তো ঝরেই যেত I আমরা খেলাঘরের কাঁঠাল বানাতাম তাই দিয়ে I যখন একটু বড় হত কাঁঠাল, ঠাকুমা বলে দিতেন কোনটা কাঁচায় রান্না হবে; আর কোনটা পাকানো হবে I মনে আছে জেঠু উঠতেন কাটারি নিয়ে মই লাগিয়ে গাছে I ঠাকুমা নিচে দাঁড়িয়ে বলতেন “ঐটে ঐটে, ঐটে কাট I এটা নয়, এটায় ভালো কাঁঠাল হবে I”

তারপর যখন কাঁঠাল পাকতো; জেঠু ফের উঠতেন গাছে I এবারে মোটা দড়ি বেঁধে নামানো হত কাঁঠাল I বাবা ধরতেন নিচে থেকে, কখনো কখনো দাদারাও ধরত সে দড়ি I তারপর কোনো এক বিশেষ দিনে, যেদিন সকালের দিকে ঠাকুমা কাঁঠাল টিপে টুপে বলবেন “বৌমা, আজ সন্ধ্যেবেলায় এটা ছাড়িও”; সেদিন আমাদের বড় আনন্দের দিন I

সন্ধ্যেবেলায় আমরা সব ভাই বোনেরা খেলে ধুলে এলে ভিতরের টানা বারান্দায় জেঠিমা বসতেন বড় কাঁসার থালায় কাঁঠাল নিয়ে; হাতে সর্ষের তেল মেখে, পুরনো সাড়ি পরে I আমরা সব ভাইবোনেরা বসতাম জেঠিমাকে ঘিরে, হাতে কলাইয়ের বাটি নিয়ে I মা বসত জেঠিমার পাশটিতে I মায়ের হাতেও থাকত একটা বাটি; বাড়ির ছোট বউ বলে মাও সেদিন ছোটদের দলে সামিল হবার অধিকার পেত I ঠাকুমা দাঁড়িয়ে থাকতেন আমাদের পিছনে; পুরো কাজটার তদারক করবেন বলে I জেঠিমা কাঁঠাল ভাঙতেন আধাআধি পিছন দিক থেকে; আর একটু একটু করে খুলে একটা একটা কোয়া বের করে আমাদের বাটিতে তুলে দিতেন I কোন ছেলের খাজা কাঁঠাল পছন্দ, কার বা পছন্দ রসা, সেই বুঝে I খানিকটা ভাঙ্গা হলে ঠাকুমা শুরু করতেন তদারকি “বৌমা, ঐটে তুলে রাখো, ওই বড় খাজাটা I ওটা পালুর জন্য I ” অর্থাৎ বাবা আর জেঠুর জন্য তুলে রাখা হবে বেছে বেছে সেরাগুলো I এরই মাঝে জেঠিমা টুক করে মায়ের থালায় একটা বড়সড় মায়ের পছন্দের খাজা কোয়া দেবেন তুলে, আর মা বলবেন “না দিদিভাই, ওদের জন্য রাখুন” I উত্তরে জেঠিমা বলবেন “খাও তো, তুমি একটা খেলে কম হবে না” I তবে সবটাই হবে ঠাকুমার কান বাঁচিয়ে, চুপিচুপি I ঠাকুমা দেখতে পেতেন কিনা জানিনা; তবে বলতে কখনো শুনিনি কিছু I

আমাদের খাওয়া শেষ হলে আমরা ভাইবোনেরা একটার ওপর একটা বাটি চাপিয়ে রেখে উঠে যাব I আর ঠাকুমা বসবেন দুকোয়া রসা কাঁঠাল নিয়ে Iতাই খাবেন সারা সন্ধ্যে ধরে I জেঠিমা আর মায়ের কাজ তখনো শেষ হয় নি I ওঁরা তখন কাঁঠালের দানা ছাড়াবেন বসে বসে I সেগুলো শুকিয়ে নিয়ে ভাজা হবে, আর আমরা পরে তাই খাব দুচার দিন রেখে রেখে I জেঠিমা কি খেতেন কখনো দেখিনি. সত্যি-ই ওনার জন্য কিছু থাকত কিনা তাও খেয়াল করার বয়েস হয়নি তখন I তবে মা নিশ্চয়ই কিছু না খাইয়ে ছাড়তেন না বলেই মনে হয়!

প্রায় ছ-সাত বছর হলো কাঁঠাল খাইনি I এখানে পুরো কাঁঠাল খাওয়ার লোক নেই I ফলে তা কেনারও প্রশ্ন নেই I পুনেতে রাস্তায় কোয়া ছাড়িয়ে বিক্রি করতে দেখেছি কাঁঠাল I কিনতে মন হয় না I মা-জেঠিমা কাঁঠাল ছাড়িয়ে পাতে কোয়া তুলে দেবেন, তবে তো কাঁঠাল খাওয়া! নাহলে আর কাঁঠাল খাওয়া কি? তাই রাস্তায় হঠাৎ যেতে যেতে কাঁঠালের গন্ধ পেলে মনে মনে ছোটবেলার কাঁঠাল খাওয়ার দিনগুলোর কথা মনে করি আর বুঝতে পারি আরেকটা কাঁঠালের মরশুম চলে গেল. এবারেও আমার কাঁঠাল খাওয়া হলো না!

.

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: